মক্কার বাতাসে ওড়ে বাঙালি শ্রমিকের কষ্ট



রোজি ফেরদৌস : ধর্মীয় কাজকর্মের মধ্যেও আশপাশে নজর দিয়েছি। লক্ষ্য করেছি কাবা শরিফের বেশির ভাগ পরিচ্ছন্নকর্মীই বাংলাদেশের। তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সুবিধা-অসুবিধা জানতে চেয়েছি। তারা প্রায় সবাই সাতশ� সাড়ে সাতশ� রিয়াল বেতন পান। এর সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেয়া দান থেকেও ভালো আয়-রোজগার করেন। সব মিলিয়ে তারা মোটামুটি সুখী। তবে কুমিল্লার এক পরিচ্ছন্নকর্মী বললেন, এখন বেশ কিছু পাকিস্তানি বিশেষ করে ভারতীয় পরিচ্ছন্নকর্মী এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দেন-দরবার করে তাদের এখানে পাঠাচ্ছেন। এদের বেশির ভাগই কলকাতা ও কেরালার মানুষ।
হারাম শরিফের বাইরের প্রাঙ্গণের প্রায় সীমানা ঘেঁষে রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া স্থানেই বিশাল বিশাল হোটেল। এসবের নিচের বেশ কয়েকটি তলায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম। দোকানপাটে ভরা এসব গর্জিয়াস মার্কেটে কেনাকাটা চলছে। ঘড়ি, জায়নামাজ, আতর, খেজুর, বিখ্যাত চেইন শপ, মাদার কেয়ার, ওষুধ, বোরখা, হুইল চেয়ার, প্রসাধনী, খাবার দোকানে ভরা এসব মার্কেট। �মক্কা ক্লক টাওয়ার� সুবিখ্যাত এক শপিং সেন্টার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর উচ্চতর এই ভবনের মাথায় বিশাল আকারের ঘড়ি। এই ঘড়ি মক্কার বহু দূরবর্তী এলাকা থেকেও দেখা যায়। এমনকি প্রায় দশ-পনেরো কিলোমিটার দূরত্বের হেরা পর্বত এলাকা থেকেও এই ঘড়ির মিনার দেখা যায়।
এই শপিং সেন্টারেও দেখা মিলল বেশ কিছু বাংলাদেশী তরুণ ও যুবকের। তারা বেশির ভাগই রেস্টুরেন্ট, ফলের জুস, বোরখা, জায়নামাজ, তসবিহর দোকানে চাকরি করেন। কারওবা আছে নিজেরই দোকান। আমার সাংবাদিক পরিচয় জেনে প্রায় সবাই একটি সমস্যার কথা তুলে ধরলেন। আমার প্রশ্ন ছিল আপনারা কেমন আছেন? মক্কা ক্লক টাওয়ারের আবরা আলবেত টেস্টি কফিশপে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলেন স্মার্ট যুবক সাইফুল ইসলাম। কুমিল্লার ছেলে। পাঁচ বছর হয় আছেন মক্কায়। তিনি ওই টাওয়ারের একটি কক্ষে থাকেন। তার মালিকের বেশ কয়েকটি দোকান দেখাশোনা করেন। বললেন, আমি ভালো আছি। তবে অন্য বাংলাদেশীরা ভালো নেই। কেন ভালো নেই? বললেন, হাসিনা সরকারের সময় সৌদি আরবে প্রবাসীদের অবস্থা খুবই খারাপ। জিজ্ঞেস করলাম খারাপটা কেন? তিনি বললেন, বর্তমানে পারমিট ওকে করে না। পারমিট কি? কিসেরবা পারমিট? জানতে চাইলাম। বললেন, পারমিট হচ্ছে আরবি ভাষায় আকামা বা ভিসা। এ ব্যাপারে তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে বহু কথা বললেন। এই আকামা বা ভিসার বিষয়টি পরিষ্কার জানতে বিভিন্ন শপিং সেন্টার, এলাকা ও সাধারণ দোকানপাটে ও অন্য বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশের ছেলে সাইফুদ্দিন আহমদ। তিনি জমজম টাওয়ারের �আবায়েব� নামের দোকানে কাজ করেন। ১২ বছর হয় আছেন সৌদি আরবে। তিনি বললেন, বর্তমান ভিসা ট্রান্সফার বন্ধ। অন্য দেশে ২ বছরের ওয়ার্ক পারমিট দেয়া হয়। বাংলাদেশীদের দেয়া হয় না। তিনিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেন। দিনাজপুরের আখের বর্ডার এলাকার মোঃ রবিউল ইসলাম সৌদি আরবের ট্যাক্সি ড্রাইভার। তিনি ১০ বছর ধরে সেখানে আছেন। এ ব্যাপারটি তিনিই সবচেয়ে ভালো বললেন। তিনি বললেন, যার মাধ্যমে এখানে লোকজন এ ধরনের কাজ নিয়ে আসেন তাকে �কফিল� বলা হয়। তারা হচ্ছে এদের জামিনদার। এদেশের সরকার অন্য দেশ থেকে লোক আনার জন্য তাদের আকামা বা ওয়ার্ক পারমিট দেয়। আকামা হচ্ছে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব। দুই বা তিন বছর পর এই ওয়ার্ক পারমিট বা ভিসা রিনিউ করাতে গেলে সেই কফিল তখন ৮ থেকে ১০ হাজার বাড়তি রিয়াল দাবি করে। ওই শ্রমিকের পক্ষে অত রিয়াল দেয়া সম্ভব হয় না। তখন থেকে সে বাঁধ্য হয়ে পালিয়ে থাকে। এই কফিলদের বেশির ভাগই ধান্ধাবাজ। বিপদে পড়া ভিসা রিনিউ করা শ্রমিক যখন বলে আপনি আমার ভিসা রিনিউ না করলে আমাকে তো পুলিশে ধরবে। এমন কফিলও আছেন যিনি তখন বলেন, পুলিশ ধরলে বল আমার সঙ্গে কথা বলতে। ওই লোক পুলিশের হাতে ধরা পড়লে পুলিশ যখন তার মোবাইলে ফোন করে তখন ওই কফিল বলে, হ্যাঁ, সে আমার পারমিটে এসেছিল। তবে সে এখন পলাতক। তখন সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ওই বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করে। রবিউল দুঃখ করে বললেন, জানেন আপা, এভাবে বহু বাংলাদেশী এখন সৌদি কারাগারে রয়েছে। তাদের কষ্ট বর্ণনাতীত।
এতক্ষণে বুঝলাম কেন সাইফুল ইসলাম ও সাইফুদ্দিন এতটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাইফুল তো নির্ভীকভাবে বললেন, হাসিনার কাছে প্রশ্ন� ভিসা কেন বন্ধ? এই ভিসা বাংলাদেশ থেকে নিতে গেলে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা দিতে হয়। অথচ বাংলাদেশ থেকে আসতে মাত্র ২ লাখ টাকা খরচ হয়। এটা সৌদি সরকার থেকে ধার্য করা। তা হলে প্রশ্ন ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নেয়া হয় কেন? তিনি বলেন, আমি জানতে চাই এতে কি মন্ত্রী-এমপিদের হাত আছে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি এসব জানেন? প্রধানমন্ত্রী ওমরাহ হজ করতে এলে তাকে অনেকেই এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে গিয়ে ব্যাপারটি ঠিক করবেন। অথচ সেও দুই বছর আগের কথা। তিনি আবারও ওমরাহ করে গেলেন। তিনি এ ব্যাপারে কিছুই করেননি। কিছু বলেনওনি। আমাদের বিষয়টি এড়িয়ে তিনি চলে গেছেন।
সাইফুদ্দিন বললেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিভিশনে বলেছেন সৌদি আরবে অবৈধ প্রবাসীদের বৈধ করা হবে। এক বছর আগেও তিনি বলেছিলেন, দুই এক মাসের মধ্যেই ভিসা হবে। তিনি বলেছেন, বাদশাহ আবদুল্লাহ হাসিনাকে বোন ডেকেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন এতদিনও সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হচ্ছে না কেন?
তার মুখে অভিযোগের তুবড়ি ফুটছিল। বললেন, বার্মিজ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশী পরিচয়ে সৌদি আরবে ভিসা নিয়ে আসে। তারা এখানে এসে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। অথচ নাম জয় সত্যিকার বাংলাদেশের। বললাম, তাদের ভিসা দেয়া হয় কেন? সাইফুদ্দিন বললেন, তারা অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে ভিসা নেয়। সৌদি আরবে তাদের পিতা বাস করলেও তাদের বয়স ১৮ বছর হলে নতুন ও নিজস্ব পাসপোর্ট লাগে। এসব বার্মিজ যুবক তখন দেশে গিয়ে ২ হাজার রিয়াল অর্থাৎ আড়াই লাখ টাকা বাড়তি দিয়ে ভিসা নেয়। আর এ সবের সঙ্গে বাড়তে থাকে দূতাবাসের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা।
মক্কার আলজিয়াদ আল সুদ এলাকার �মাহলে নায়ের�-এর কর্মচারী চট্টগ্রামের নূর মোহাম্মদ বললেন, ট্রান্সফার নামেও একটা ভিসা আছে। এক কফিলের কাছ থেকে আর একজন কফিলের কাছে যাওয়া যেত। এখন সেটিও বন্ধ হয়ে আছে। তাহলে আমরা যারা বহু দিন, বহু বছর হয় এসেছি তারা দেশে ফিরব কেমন করে? তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধচিত্তে বললেন, এই সরকারের শুধু এক গান। তারা আয় করেছে, আয় করেছে। অথচ কূটনৈতিক কাজে তারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের ২৪ লাখ মানুষ এ দেশে কাজ করছে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশে যাচ্ছে। অথচ সেই মানুষদের সমস্যা বিপদ-আপদে সরকার তাদের পাশে নেই। আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী সবার পদত্যাগ চাই। এরা অনভিজ্ঞ। প্রেস ক্লাবের সামনে (১৯-১০-১১) আজ শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করে অর্থ হারানো মানুষেরা অনশন করছেন। তাই তাদের পদত্যাগ করা উচিত।
মক্কার আলজিয়াদ থেকে মিনার কাছাকাছি আজিজিয়া এলাকায় অবস্থিত �আজিজিয়া সুপ সালাম সুপার মার্কেট।� সেখানে এক দোকান মালিক ফরিদুল আলম। তিনিও বাংলাদেশীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেন। বললেন, সরকার রাজনীতি করে না। করে পেটনীতি। তারা বিদেশে শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে না। এখন ১০০ জনের মধ্যে ৮০ জন বাংলাদেশী কষ্টে আছেন। তাদের তদারকি করার কেউ নেই। বাংলাদেশের কোন ভিসা নেই। ট্রান্সফার নেই। সরকারকে এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে হবে। বিদেশে সৌদি আরবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। অথচ সরকারের ওপরতলার মানুষেরা এ ব্যাপারে খোঁজখবর করে না। তিনি বললেন, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের কেরালাররা। তারা দোষ করে বেশি। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেশি। এদেশে তাদের �পত্রিকা� আছে। সেই পত্রিকায় তাদের দোষ চাপানো হচ্ছে বাংলাদেশী সরকারের ওপর। তারা ডাহা মিথ্যা কথা লেখে। এ কারণেও বাংলাদেশীরা ঠিকমতো চাকরি পাচ্ছে না। এ জন্য এ দেশে বাংলা পত্রিকা দরকার।
মদিনাতে গিয়েও একই হাহাকার শুনেছি চাকরিরত বাংলাদেশী যুবকদের মুখে। মসজিদে নববী থেকে আধা কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশী বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট, কসমেটিকসসহ নানা ধরনের দোকানে বাংলাদেশী তরুণ-যুবকেরা কাজ করেন। চট্টগ্রামের যুবক ফারুক হোসেন কাজ করেন বাবআল তামারের �আরাবসাট গিফটস� দোকানের সেলসম্যান হিসেবে। চোখে মুখে বিষাদের ছায়া। বললেন, ৭ বছর হয় এদেশে এসেছি। কিন্তু দেশে যেতে পারছি না ভিসা বন্ধ বলে। বুঝলাম সৌদি আরবে আমাদের ভাই, সন্তানসম মানুষের দুঃসহ কাল কাটাতে হচ্ছে। অথচ এদের জন্য সরকারের দেন দরবার করে এই সমস্যার সুরাহা করা উচিত।
এবার ধর্মীয় কাজগুলোর দিকে ফিরে আসি। মক্কায় আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই কাবাঘরে গিয়ে নামাজ পড়তাম। এভাবে ২২ দিন যাওয়ার পর ২৩ তারিখ রওয়ানা হলাম পবিত্র নগরী মদিনা মনোয়ারার দিকে। মনোয়ারা মানে নূরের সমষ্টি। আমাদের এজেন্ট এহসান এয়ার ট্রাভেলসের নিয়োগ দেয়া মোতাওয়ালি বা গাইড মক্কা-মদিনার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে গেলেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ওহুদ পর্বত, মসজিদে কুবা, মসজিদে কেবলা আইন, খন্দক যুদ্ধের এলাকা। এ ছাড়া হজের সময় প্রচণ্ড ভিড়ে যদি সব স্থান ঠিকমতো দেখতে বা চিনে নিতে না পারি সেজন্য আগে থেকেই তিনি নিয়ে গেলেন মিনা, মুজদালিফা ও নামিরা মসজিদসহ আরাফাতের ময়দান দেখাতে। দেখা হল জাবালে রহমত, যাকে ইংরেজিতে বলে �মাউন্ট অব মার্সি�। সেখানে মা হাওয়া ও বাবা আদম আলাইহি ওয়া আসসালামের মিলন হয়েছিল এবং পাপ মার্জনা হয়েছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে রাসূলে করিম (সা.) বিদায় হজের শেষ সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ দিয়েছিলেন।
Post a Comment