বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান মসজিদ


ফরহাদ জাকারিয়া : ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় মসজিদ এমন একটি কেন্দ্র যা অন্য কোনো সমাজ ব্যবস্থায় নেই। শুধু ইবাদতখানা হিসেবেই নয়, সমাজের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসার (আ.) আমল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত সব মসজিদ কেবল ইবাদতখানা ছিল। ইবাদতের কেন্দ্রস্থল হিসেবেই মসজিদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি প্রসারের মাধ্যমে মসজিদকে করেছে বহুমাত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান।
মসজিদকে বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান করার গুরুত্ব কী? মানব জীবনের পরিধি যে শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সে কথা আমরা সবাই জানি। একজন মানুষের এর বাইরেও রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন। সামাজিক জীব হিসেবে বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষকে এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মসজিদে প্রবেশ করলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মানুষের মনে খোদাভীতি সঞ্চার হয়। খোদাভীতির মধ্যে থেকেই মানুষ যেন সমাজ জীবনের এসব কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে- এটিই মসজিদকে বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান করার অন্যতম কারণ।
ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মূলত সেখানে গিয়ে তিনি একটি নতুন ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। মসজিদে নববী ছিল সেই সমাজের কেন্দ্র। সেখানে বসেই রাসূল (সা.) তাঁর সব সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। সেখানে সবাই আসতে পারত। এটি ছিল এমন একটি স্থান, যেখানে সালাত আদায় ব্যতীত মুসলমানরা রাসূলের (সা.) কাছে সমবেত হয়ে সর্বসাধারণের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। এখানেই তিনি খুতবা দিতেন, যাতে শুধু দীনের কথাই থাকত না; বরং মানুষের সামাজিক জীবনের যাবতীয় বিষয়, নিয়মনীতি সম্পর্কেও আলোচনা হতো। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, রাসূল (সা.) মসজিদে নববীকে বহুমাত্রিক এবং সর্বজনীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে নতুন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
পরবর্তীকালের ইতিহাসের দিকে খেয়াল করলে আরেকটি বিষয় খুব সহজে আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে- মুসলমানরা কোনো অঞ্চল জয় করার পর তারা সেখানে সর্বপ্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাসূলের (সা.) অনুকরণে তারাও মসজিদকে কেন্দ্র করেই সমাজ বিকাশের চেষ্টা করেছেন এবং সফল হয়েছেন। এই ধারাবাহিকতায় সুদূর ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত অসংখ্য মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানেও ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে এভাবেই মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসলামী সমাজ বিকশিত হচ্ছে।
পরিবার সমাজের প্রাচীন এবং ক্ষুদ্রতম প্রতিষ্ঠান। জন্মের পর পরিবারেই মানবশিশুর বিকাশ সাধিত হয়। কিন্তু সামাজিক জীব হিসেবে একজন মানুষের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার শিক্ষা এবং যোগ্যতা অর্জন করে। সামাজিকীকরণ কেন্দ্র হিসেবেও মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য প্রতিনিয়ত পাঁচবার মসজিদে যাতায়াতের ফলে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এর বাইরেও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মসজিদ সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববোঁধের উন্মেষ ঘটায়। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে- মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই। বর্তমানে সুখী ও শান্তিপূর্ণ সমাজের মূলমন্ত্র হিসেবে যে �ভ্রাতৃত্ববোঁধে�র কথা প্রচার করা হচ্ছে- মসজিদে ইসলামের যে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা হয়, তার দ্বারা সেই ভ্রাতৃত্ববোঁধই ত্বরান্বিত হয়।
পৃথিবীতে মসজিদই একমাত্র ঘর যা �আল্লাহর ঘর� হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। মসজিদের আধ্যাত্মিক ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আকর্ষণ করে সব মানুষকে। একত্ববাদের চিরন্তন প্রতীক মসজিদ মরুভূমির মতো শূন্য পড়ে থাকে- এটাই এখন আমাদের সমাজের বাস্তবতা। নামাজের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া অন্য সময়ে অনেক মসজিদেরই তালা খোলা হয় না। তারপরও এ কথা অনস্বীকার্য, স্বল্প মাত্রায় হলেও সমাজে মসজিদের প্রভাব এখনও টিকে আছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে মসজিদকে বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে পারলে ভ্রাতৃত্ববোঁধসম্পন্ন সুখী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন অসম্ভব নয়।
Post a Comment