বিশ্ব শান্তির দূত মুহাম্মদ (স.)- মাওলানা লুৎফর রহমান ইবনে ইউসুফ



মুহাম্মদ (স.)! (মহত্ত্ব, সহানুভূতি ও বদান্যতার মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেন। উদ্দেশ্যের মহত্ত্ব, উপায় উপকরণের স্বল্পতা এবং বিস্ময়কর সাফল্য এ তিনটি বিষয় যদি মানব প্রতিভার মানদণ্ড হয়, তাহলে ইতিহাসের অন্য কোনো মহামানবকে এনে মুহাম্মদ (স.) এর সাথে তুলনা করবে এমন কে আছে?)
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বিশ্বের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স.)কে পৃথিবীর বুকে দয়ার সাগর হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। যিনি ছিলেন ক্ষমায় অতুলনীয় এবং ধৈর্যের পাহাড়, রাহমাতুল্লীল আলামনি। নবুওয়াত লাভের পর তিন বছর পর্যন্ত রাসূলে করীম(স.) অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দ্বীনের প্রচারকার্য পরিচালনা করেন। তিন বছর পর রাসূলে করীম (স.) এর অভিজ্ঞতা ও সহনক্ষমতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ প্রদান করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, �আপনার প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশ প্রকাশ্যভাবে প্রকাশ করুন�(সূরা হিজর)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, �আপনি আপনার পরিবার পরিজন ও নিকটাত্মীয়গণকে (আল্লাহ তায়ালার) ভয় প্রদর্শন করুন� (সূরা শুয়ারা-২১৪)। এ দু�টি আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রসূল (স.) মক্কায় সাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে সুউচ্চ কণ্ঠে কুরাইশদের আহ্বান করলেন। তাঁর আহ্বানে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকজন পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হলে তিনি বললেন, �আমি যদি বলি যে, এই পাহাড়ের পেছন দিক থেকে তোমাদেরকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে একদল সৈন্য আসছে, তাহলে কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?� সবাই সমস্বরে বলে উঠল, �হ্যাঁ, আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করবো?� কেননা, আমরা আপনাকে কখনও সত্য ছাড়া মিথ্যা বলতে শুনিনি।� তিনি বললেন, �আমি বলি, তোমরা যদি ইসলাম গ্রহণ না কর, তবে তোমাদের ওপর কঠিন শাস্তি আপতিত হবে।� এ কথা শুনে তাঁর পিতৃব্য (চাচা) আবু লাহাবসহ সবাই ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ফিরে গেল (সহীহ বুখারী,- ২য় খণ্ড পৃ: ৭০২)। ওই ঘটনার পর নবী করীম (স.)-এর চেষ্টায় কিছুসংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। এর মধ্যে প্রিয় নবী (স.) এর আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্য লোকও ছিল। তারা সকলে মিলে একদিন কাবাগৃহের সামনে যেয়ে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের ঘোষণা দেয়ায় সকল কাফের, মোশরেক ও কুরাইশ বংশের লোকেরা মিলে রাসূল (স.)-কে মারাত্মকভাবে আহত করল। এমনিভাবে তার প্রচেষ্টায় মক্কায় অল্পসংখ্যক লোকের একটি দল ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের চেষ্টায় লিপ্ত হল। কিন্তু প্রিয় নবীর (স.)-এর জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হল। নবুওয়াতের দশটি বছর তিনি বহু কষ্টে মক্কায় জীবন যাপন করেন। কাফেরদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মদীনায় হিজরত করেন এবং সেখানে তিনি নবুওয়াতের বাকি তেরটি বছর অতিবাহিত করেন। প্রিয় নবী (স.) মদীনায় গিয়ে মোহাজের ও আনসারদের নিয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করেন। সেখানে অন্যান্য জাতিও ছিল। কিন্তু মক্কার কাফেরগণ রসূল (স.) এর এই উত্থান সহ্য করতে না পেরে তারা একটার পর একটা যুদ্ধ করে তাদেরকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে টিকিয়ে রাখেন। তারা সেখানে সত্যিসত্যি স্থায়ী হল। মোহাজেরগণ তাদের মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে এসেছে এবং কাবাগৃহকে প্রদক্ষিণ করতে না পেরে খুবই উদগ্রীব হয়ে পড়েছে। তখন তারা এবং মদীনার আনসাররা সবাই মিলে প্রিয় নবীর কাছে আবদার জানিয়েছে যে, আমরা হজ্ব মৌসুমে হজ্ব করতে পারি না? কারণ, এ সময় আরবে নিয়ম ছিল যে, তখন সকল প্রকার রক্তপাত ও যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকতে। তখন নবী করীম (স.) তাদের সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করে অন্যকোন উদ্দেশ্যে নয় শুধু হজ্বের জন্য যাবতীয় হজ্বসামগ্রী ও উট নিয়ে চৌদ্দশ মোহাজের ও আনসারসহ মক্কায় রওনা হন। কিন্তু হোদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে করাইশগণ এবং কাফেরগণ মিলে মক্কায় যেতে বাঁধা প্রদান করল এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাস্তায় অবস্থান করতে লাগল। প্রিয় নবী (স.) লোক পাঠিয়ে তাদেরকে বললেন যে, আমরা শুধু হজ্ব করতে এসেছি অন্য কোন উদ্দেশ্য আমাদের নেই। প্রিয় নবী (স.) এর এই খবর পেয়ে মক্কার কুরাইশ নেতাগণ তাদের দূত পাঠিয়ে হোদায়বিয়া নামক স্থানে এক সন্ধিপ্রস্তাব উপস্থাপন করে। সন্ধি মোতাবেক এই বছর মদীনাবাসী হজ্ব করতে পারবে না। তবে আগামী বছর হজ্ব বা ওমরা করবে� তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় থাকবে না। আরো কিছু শর্তসহ প্রিয় নবী (স.) এই সন্ধি অনুমোদন করেন।
Post a Comment